স্মৃতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান

কোটা বিরোধী আন্দোলনের পাদপীঠ সরকারি এম এম সিটি কলেজ

কাজী মোতাহার রহমান

খুলনা নগরীর ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার। মূলত নেতা তৈরির কারখানা। গত ষাট বছরে একাধিক জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাদপীঠ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঁচ যুগের গৌরবগাঁথা ইতিহাস এ প্রতিষ্ঠানের। ১৯৬৫ সালের ১১ জুলাই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। বানিয়াখামার মৌজার খানজাহান আলী রোডে দু’ দশমিক তেতাল্লিশ একর জমি এ প্রতিষ্ঠানের পরিধি। পাকিস্তান আমলের শেষ সময়টা সামগ্রিক রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শনের কর্মীরা প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে।

উনসত্তরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরবর্তী এ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিকাশ হয়। এক কথায় বলা যায়, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মোল্লা মোশাররফ হোসেন, জাহিদুর রহমান জাহিদ, শেখ শহিদুল হক, হুমায়ুন কবির বালু, হেকমত আলী ভূঁইয়া, হায়দার গাজী সালাহউদ্দিন রুনু, শিকদার আনোয়ারুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ননী, নুরুজ্জামান বাচ্চু প্রমুখ।

১৯৭১ সালে ৭ মার্চ গঠিত স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, খুলনার কমিটিতে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবির বালু, শেখ শহিদুল হক, হায়দার গাজী সালাহউদ্দিন রুনু ও হেকমত আলী ভুঁইয়া ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়।

এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন : মোল্লা মোর্শারফ হোসেন (স্বাধীনতা পূর্ব ছাত্র সংসদের ভিপি, আনন্দনগর, রূপসা), জাহিদুর রহমান জাহিদ (বাগমারা), শেখ শহীদুল হক (স্বাধীনতা পূর্ব ছাত্র সংসদের ভিপি, শেখপাড়া), এ্যাড. আ.ফ.ম মহাসীন (পশ্চিম টুটপাড়া), নাট্যকার জুল কাদির, শরীফ খসরুজ্জামান (সাবেক সংসদ সদস্য, নড়াইল), হুমায়ুন কবীর মোল্লা (আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর), আব্দুস সামাদ তরফদার (স্বাধীনতা পরবর্তী ছাত্র সংসদের ভিপি, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), শেখ আফজালুর রহমান (পৈপাড়া, খুলনা), আব্দুস সালাম (পূর্ব বানিয়াখামার), শেখ মহাসীন (নৌ কমান্ড), শেখ মোঃ মিজানুর রহমান (তালা, সাতক্ষীরা), শেখ আতিয়ার রহমান (কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), ইবনে সিনা ওয়াহিদ মিকি (ডুমুরিয়া, খুলনা), নুরুল ইসলাম মনু (টিবি ক্রস রোড, খুলনা), এস এম ওয়াহিদ উন নবী (হাজী মহাসীন রোড, খুলনা), অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল খালেক (চানমারী বাজার, খুলনা), চিত্তরঞ্জন স্বর্ণকার (কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), জি এম হুমায়ুন কবীর (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা), নুরুল ইসলাম খোকন (কেশবপুর, যশোর), শেখ আব্দুস সাত্তার (টুটপাড়া, খুলনা), নজরুল ইসলাম ইজারাদার (জিন্নাহপাড়া, খুলনা), এস এম জিয়াউল ইসলাম (ডুমুরিয়া, খুলনা), শেখ আবুল কাশেম (যাত্রাপুর, বাগেরহাট), শেখ সাঈদ আলী (সিমেট্রি রোড), খন্দকার সাজ্জাদ আলী (টুটপাড়া), শিকদার আনোয়ারুল ইসলাম (লোহাগড়া, নড়াইল), শেখ আজমল হোসেন (পাইকপাড়া, বাগেরহাট) ও শামসুর রহমান খান (পিরোজপুর), কয়রার জি এম রেজাউল করিম, মোঃ করিম মোল্লা, আব্দুর রহমান সানা, এস এম গোলাম রব্বানী, জি এম মাওলা বক্স, মতিউর রহমান প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এ প্রতিষ্ঠানের গর্বিত শিক্ষার্থীরা হচ্ছে শেখ আজমল হোসেন, ওলিউর রহমান, নাসিরুজ্জামান ও মোহর আলী।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান জেঃ এইচ এম এরশাদ দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। তিনি সংসদ ভেঙে দেন। দেশে চলে তার একনায়কতন্ত্র। ক্ষমতার জোরে ১৯৮৬ সালে ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেন। ছাত্রজনতার আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ জমানার পতন হয়। ১৯৮২-১৯৯০ পর্যন্ত স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন পারভেজ আলম খান, এস এম কামাল হোসেন, এস এম জাহিদুজ্জামান, উৎপলেন্দু কীর্ত্তনিয়া, শেখ আবু হাসান, কাজী মোতাহার রহমান, আনিসুর রহমান কচি, কার্ত্তিক চক্রবর্তী, এমদাদুল হক হাসিব, শেখ আলী আকবর, শেখ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ মোরতুজা শেখ, জাহাঙ্গীর আলম, এস এম আসাদুজ্জামান মুরাদ, মোঃ হুমায়ুন কবির, জহিরউদ্দিন পান্না, রুনা লায়লা, শাহীন রেজা খান, শেখ সেলিম আল আজাদ, মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা বিরোধী, অসহযোগ ও স্বৈরশাসন বিরোধী সরকার পতনের আন্দোলনে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল পূর্বসূরিদের ন্যায়। ১ জুলাই আত্মপ্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের নয়া প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন খুলনা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া পথ বেয়ে আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নেয় এখানকার শিক্ষার্থীরা। এ প্রতিষ্ঠানের আন্দোলনরতরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলে। ছাত্র সমাজ অবস্থান নেয় কোটার বিরুদ্ধে। অংশ নেয় শিববাড়ী মোড়সহ বিভিন্ন স্থানের কর্মসূচিতে।

আন্দোলনকারীরা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ৬ জুলাই ক্লাশ, পরীক্ষা বর্জন, ছাত্র ধর্মঘট এবং সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধের ডাক দেয়। কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’। ৭ জুলাই কেন্দ্র আহুত অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিলে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাড়া দেয়। তাদের সাথে সাথে সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয় ও জিলা স্কুলের ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল এ প্রতিষ্ঠানের গর্বিত শিক্ষার্থী ১৯৫২ সালের ভাষা সৈনিক ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া তাদের পূর্বসূরিদের ন্যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্মসূচি জানার পর মধ্য জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আন্দোলনে নামে। শিববাড়ী মোড়, জিরো পয়েন্ট, গল্লামারী, খুবি ক্যাস্পাস, সাত রাস্তা মোড়, পাওয়ার হাউস মোড়, রয়্যাল চত্বর ও জিলা স্কুল চত্বরে প্রতিটি কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ প্রশংসার দাবিদার। আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীদের পিছু হটাতে তালতলাস্থ বাসভবনে ডেকে কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নানা পরামর্শ দিতেন।

দেশব্যাপী গণহত্যা শুরু হলে এখানকার সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। কলেজে দীর্ঘ সময় ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন মোঃ সজল হোসেন তালুকদার, মোঃ মাহবুব হাসান ইমন, অভিজিৎ চক্রবর্তী, রিতু আক্তার, আকাশ সাহা, মোঃ শাহরিয়ার রুশান, সানিয়া আক্তার মাহিলা, মাঈসা খান, ফারহানা ইয়াসমিন, শাকিব আহমেদ অন্তর, শাহরিয়ার আসিফ, তামিম ইকবাল, বাপ্পা রায়, শেখ মোঃ শিহাব উদ্দিন শুভ, মোঃ নাসিরুল কবির বাবু প্রমুখ। ২ আগস্ট সাত রাস্তা মোড়ে তারা সরকারের পক্ষ নিয়ে সমাবেশে আয়োজন করে। ১৫ জুলাইয়ের পর কলেজ আঙিনায় পুলিশ মোতায়েন হয়। একপর্যায়ে খালিশপুরস্থ সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজে নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন জেলা প্রশাসন।

তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, দ্বাদশ সংসদের সদস্য এস এম কামাল হোসেন ও জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফীন উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গণে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

শাসকদের এ উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশের লাঠিচার্জে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান প্রদীক, উর্মি ও রিয়ান আহত হয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা ১৭-১৯ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউন, ২৭ জুলাই ব্লক রেইড, ৩১ জুলাই মার্চ ফর জাস্টিস, ১ আগস্ট রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ, ২ আগস্ট শিক্ষক-নাগরিক সমাজের দ্রোহ যাত্রা, ৩ আগস্ট সরকার পদত্যাগের এক দফা ও ৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ১৯ জুলাই থেকে খুলনা জেলা প্রশাসন কারফিউ জারি করলে ছাত্র সমাজ তা ভঙ্গ করে। ১৬ জুলাই বিজিবি, ১৯ জুলাই সেনা মোতায়েন, র‌্যাব, পুলিশ ও নৌবাহিনীর টহল উপেক্ষা করে মহল্লা ও ছাত্রাবাসে কোটা বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে জনমত বাড়াতে শিক্ষার্থীরা সাহসী ভূমিকা পালন করে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন : এমডি আওসাফ, তানভীর রহমান প্রতীক, শাহরিয়ার হোসেন অনিক, জায়েদ খান, মোঃ মুত্তার্কী, সামিয়ুল ইসলাম পার্থ, মোস্তফা আব্দুল্লাহ, সাদমান রাইয়ান, সাজিদ হাসান, মোস্তফা আব্দুল্লাহ, তাওসান রাফি, ইশতিয়াক ইসলাম, মোঃ আওসাফ, মাহির আরাফাত রহমান, শাহরিয়ার অর্পণ, মোঃ ইশরাক হোসেন, সৌমিক সাহা দ্বীপ, সামিদ খান, মোঃ সিরামুজ্জামান, আলী নুর, আল ইমরান ফয়সাল, সাকিব রেজা, উর্মি, রিয়ান, এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র মোঃ তাহসান হোসেন হৃদয় (বর্তমানে ঢাবি), এনামুল, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মান শ্রেণির ইসমত আনন, আদিরাত হাসান ও সাদিয়া স্নিগ্ধ।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন